রাস্তায় জ্যাম কম। অফিস শেষে বাজারে ঢুকলাম বিকাল পৌনে পাঁচটার দিকে।
নো ফ্রিলস দোকানে বাজার করার ট্রলি নেবার এক ডলারের কয়েন না থাকলেও ঢোকার মুখে একটা খোলা, ফাঁকা ট্রলি পেয়ে গেলাম। বরাবরের মতোই ভেতরে গিয়ে মাথা গেল আউলিয়ে; বাজারের লিস্ট মনে করতে পারছি না। অথচ আইটেম মাত্র চারটা। মোবাইলের নোট খুলে দেখি নেস-টি, চিনি, চায়ের দুধ আর তেল।
নেস-টি দশটার টেট্রাপ্যাক দুই টাকা অষ্টআশি সেন্ট’স। সাধারণত সারে তিন থেকে চার টাকা করে। চার প্যাকেট নিলাম; চার টাকা সেভড। বাচ্চারা আগে জুস খেতো। এখন বড়ো হয়ে নেস-টি [নেসলে কোম্পানির তরল রেডিমেড র’চা] আর কফি খাওয়া শিখেছে। ও হ্যা, কফি সেকশনেও ঢু মারতে হবে, যদিও দরকার নাই..।
ভোজ্য তেলে ভালো ডিসকাউন্ট। আমি ফ্লায়ার দেখেই এখানে এসেছি।
তিন লিটারের তেল সাত টাকা করে দিচ্ছে। করোনা শুরুর পর বেশ কয়েক বছর পর এতো সস্তায় দিচ্ছে। তাহলে কি কানাডার ভোজ্য তেল উৎপাদন আবার বেড়েছে? চিনের কাছে ক্যানোলা তেলের এক্সপোর্টের ঝামেলার কারণ, প্লাস ইনফ্লেশনের কারনে তিন লিটারের তেলের ডিব্বা তেরো/চৌদ্দ টাকা করেও কিনেছি। অথচ পাঁচ বছর আগে কিনতাম পাঁচ টাকায়। চারটা কন্টেইনার নিলাম। এই বারো লিটারে তিন/চার মাস যাবার কথা। বাসায় তেলের স্টক শেষ পর্যায়ে।
চায়ের দুধের দিকে এগুতেই চোখে পড়ে গেল ফালি করা পাঙ্গাস মাছের প্যাকেট। এমনিতে প্যাকেট দশ টাকা, আজকে সাত টাকা। নিলাম দুই প্যাকেট। বাচ্চারা গপ গপ করে খায় ভাতের সাথে গরম মসুর ডাল দিয়ে। সাথে গিন্নি পাতাকপির বড়াও ভেজে রাখে। সেদিন এতোই খাওয়া হয়, সন্ধ্যা পর্যন্ত মরার মতো ঘুমাই। পাতাকপির স্টকের কি অবস্থা কে জানে! আর মসুর ডালের? আন্দাজে কেনা যাবে না। আগেরগুলো থাকতেও পারে।
ভাগ্য ভালো ট্রলিটা পেয়েছিলাম। তা না হলে সব কিছু অল্প করে কেনা লাগতো। চায়ের দুধেও ছাড়; চার টাকার ১০% ক্রিমের এক লিটার দুধ আজকে তিন টাকা। মাঝে মাঝে আরো কমেও পাওয়া যায়, কিন্তু সেগুলা ফ্রিজে বেশিদিন টিকে না। বেশি সস্তায় কেনাটা আরও লস। এদেশে সস্তায় ছেড়ে দেওয়ার পেছনে কারণ থাকে। তাই নাক খপ্তা দিয়েছি, আর কিনি না। দুগ্ধজাত পণ্যে খুব বেশি ছাড় থাকা মানে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়।
লিস্টে না থাকলেও কলা নিলাম পাউন্ড দুয়েক। বাচ্চাদের স্কুলের বন-রুটিও নিলাম দুই প্যাকেট। তিন টাকার প্যাকেট দিচ্ছে দুই টাকায়।
বাহ্!
এতো ছাড় দেবার পেছনে কারন হতে পারে পাবলিকের লবলৌজ [মূল কোম্পানি] বয়কট করা। এ কোম্পানি অস্বাভাবিক মুনাফা করছে; বিলিওন ডলার এক্সট্রা! অথচ অন্যদিকে গ্রোসারী ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে সাধারণ মানুষের। সরকার থেকেও চাপ দিচ্ছে মুল্য কমাতে। আসলে এদের ব্যাবসা মনোপলী, প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। বয়কট কি তাহলে কাজে দিচ্ছে?
ও হ্যা, ঝাল মরিচের গুঁড়াও কিনতে হবে।
গতবার কিনেছিলাম, গিন্নির অভিযোগ একদম ঝাল না। তাই মসলার সেকশনে খুঁজে এক্সট্রা হট লেখা চারশো গ্রামের মরিচ গুঁড়ার প্যাকেট নিলাম। এটাও প্রায় এক টাকা ছাড়ে। খুব আফসোস লাগে, আমাদের বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা কী করছে? সব মশলা ভারতীয় কেন? ওরা মশলার ব্যবসা করে কয়েকশো মিলিয়ন ডলারের। আর আমরা? আমাদের কি জাতীয়ভাবে মার্কেট রিসার্চের কোনো ব্যবস্থা নাই? প্রাণ যেটুকু ব্যবসা করে এদেশে, তা তুলনামূলকভাবে খুবই সীমিত।
চিনির সেকশনেও অনেক স্টক। দুই কেজির প্যাকেট আগে ছিল সাড়ে তিন টাকা; কিন্তু আজ দুই টাকা। চার প্যাকেট নিলাম। আগে দেখতাম চিনি আর চায়ের দুধের সেল থাকলে বিকালের দিকে আর নাই, স্টক শেষ। মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কানাডার নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষ খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু আজ স্টক অনেক। তারমানে মানুষের লবলৌজ বয়কট কাজে দিচ্ছে?
ভালো!
বিল দিতে গিয়েও ক্যাশিয়ার জিজ্ঞেস করলো আমার পিসি অপটিমাম দশ টাকা জমেছে, রিডিম [খরচ] করবো কি না। রাজি হয়ে গেলাম। এমনিতেই ছাড়, তার ওপর আরও দশ টাকা! নব্বই টাকার বিল দিলাম আশি টাকায়।
গাড়িতে সদাই তুলে ট্রলি জায়গামতো রাখতে গিয়ে দেখি এক ডলারের কয়েন ট্রলির কি-হোলের ভেতরে রয়েই গেছে। কেউ ভুল করে কিংবা ইচ্ছা করেই হয়তো রেখে গেছে। এদের কাছে একটা ডলার কিছুই না। ভাগ্যটা আমার আজ আসলেই ভালো..
খিদেটা বেশ চাঙ্গা হয়ে এসেছে! বিকাল সোয়া পাঁচটা বেজে গেছে।
আচ্ছা, কাল দেখলাম গিন্নি পুরানা শুঁটকি মাছের ডিব্বা বের করে বেছে রাখছে।
ভাগ্য কি তাহলে আজ এতটাই ভালো?
আমি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ছুঁচোর মতো শুঁটকির গন্ধ শুঁকে শুঁকে বাসার দিকে এগুতে থাকি..