
প্রকৃতির তীব্র তাপদাহ মানেই সামনে অপেক্ষারত শরৎ, হেমন্ত, শীত আর বসন্ত কে আলিঙ্গন করবার অপেক্ষা। গোলাপ, ডালিয়া, সূর্যমুখী, গাঁদা, কসমস আর মহামুল্যবান মুলা, গাজর, ফুলকপি, বাধাকপি, পালং শাক, লাউ-কুমড়া। ওদিকে পুকুরে মাছগুলো বড়ো হতে থাকে শীতের শব্জির সাথে মিতালি করবার অপেক্ষায়। তাই অতিষ্ট গরম মানেই যে শুধু কষ্ট; তা নয়। আশা, ভরসা, স্বপ্নও।
যাই হোক, স্বপ্ন দেখে তো আর পেট ভরবে না..
দুপুরের তীব্র গরমে রেডক্সাইড মেশানো সিমেন্টের চকচকে পালিশ করা ঠান্ডা লালচে মেঝেতে শোভা পাবে মাটির হাঁড়িতে মোটা দানার মাড় গালানো সুস্বাদু ভাত, ভেজে নেয়া প্রচুর কাঁটাযুক্ত ফলই মাছের ঝোল, আলু ভর্তা, বাগাড় দেয়া ডাল। সাথে কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা, লবন। মাছের ঝোলে কলাপাতা রঙের চিচিঙ্গার ফালি। ভাজা মাছের চামড়া আর কাঁটা থেকে রাজকীয় সুবাস চুইয়ে চুইয়ে মিশবে কাঁচামরিচ, আদা-রসুন বাটা দেয়া সর্ষে পেঁয়াজের ঝোলে। হয়ে উঠবে অমৃত সুধার খনি। সেই ঝোল যখন অন্ননালী গড়িয়ে দুষ্টু ডানপিটে ছেলের মতো খিলখিলিয়ে হেসে নিচে নেমে পাকস্থলী ধৌত করে পরিপাক রসের সাথে মুলাকাত করা শুরু করবে গো.. ঠিক যেন খড়খড়ে শুষ্ক বিকালবেলায় চাতকদৃষ্টির পটল ক্ষেতে হঠাৎ বৃষ্টির উৎসব। নেতিয়ে পড়া টমেটো গাছ যেমন সেচের পানি পেয়ে আবার তরতাজা হয়ে বাতাসে দুলে দুলে কোরাস গায়; ঠিক তেমনি পাকস্থলী কে বিদায় জানিয়ে বৃহদান্ত্রে গিয়ে খাদ্যকণাগুলো রক্তের শিরা-উপশিরায় দল বেঁধে মিছিল করতে করতে সুখের কোরাস গাইতে থাকবে। শুরু হবে পাহাড়ি আনন্দ নৃত্য!
শুকনার কোন কারবার নেই।
সবকিছু ভেজা। পাতলা ডালের জলচ্ছাস, কাঁঠাল ঘন্টের অর্ধগলিত লাভা, কাগজী লেবু। ঝাঁঝালো ছোট্ট আকাশী শিশু পেঁয়াজে প্রেম কামড় পড়তেই ঝর্ণার মতো ছিটকে ছড়াবে কিছু রস.. ঠিক এভাবেই চড়ুই পাখি তীব্র গরমে গোসল করে জলকেলি করে! কড়া বাগাড় দেয়া ডালে খিড়া কিংবা শসা হলদে হয়ে যাবে হলুদ শুষে। শসার সুবাদে একটু ঠান্ডার অনুভুতি জাগবে। তবে থালার তলা গোছগাছ করে শেষ টান দেবার পর ব্যাঁকাত্যাড়া এলুমিনিয়ামের গ্লাসে টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানি পানের পর বেশ আরাম বোধ হবে। কপাল, নাকের ঘাম শুকিয়ে স্বাচ্ছন্দ বোধ হবে।
বাড়ির বাইরে, উঠোনের প্রান্তে গাছে ঝুলবে কচি সজনে ডাঁটা। হাল্কা বাতাসে দুলবে। ককিল ডেকে জানান দেবে কোকিলা কে। বিরাট ছাতার মতো কচু গাছটার আশপাশে ঘোরাঘুরি করবে ছাগলটা। নিম্নশ্রেণীর প্রাণীও বোঝে ছায়ার মহত্ব।
হাত ধোবার ঠিক আগে আসবে সস্তা মোটা খয়েরী কাগজের প্যাকেটের সস্তা চমচম। দুনিয়ায় শ্রেষ্ঠ ডেজার্ট। মিষ্টির গায়ে চিনির মুচমুচে প্রলেপ পেষন দাঁত দিয়ে ভাংতেই মধু গলগলিয়ে নেমে মুখমন্ডল মিষ্টি করে দেবে। ছানার গন্ধের সাথে সুমিষ্ট মেটে সুবাস আনবে তৃপ্তির চূড়ান্ত পর্যায়।
তারপর হঠাৎই সিলিং ফ্যানের ঘটঘটানি আওয়াজ থেমে যাবে। বাইরে গিয়ে মাটির রাস্তার পাশে আমগাছের নিচে বাঁশের বেঞ্চিতে শুয়ে এক লম্বা ঘুম। শীতল ছায়া দেবে প্রশান্তি, হালকা বাতাস দেবে স্নেহের পরশ। আশপাশ দিয়ে মহিষ গেল, না বাঘ; সে নিয়ে বিন্দু মাত্র মাথা ব্যাথা নেই। সেই গভীর নিশ্চিন্ত ঘুমের কোনো তুলনা নেই। শতভাগ অর্গানিক। সেখানে নেই কোনো প্রযুক্তির আসক্তি, নেই চাকরি নিয়ে দুশ্চিন্তা, নেই ক্রেডিট কার্ডের বিল দেবার তাড়া, সম্পদ হারাবার সংশয়।
শুধুই বর্তমান নিয়ে ভাবনা।
বর্তমান নিয়েই সন্তুষ্টি। আর ভবিষ্যতের জন্য তো একজন আছেনই; অসীম দয়াময় মহা শক্তিধর !
অটোয়া, কানাডা