3 C
Toronto
রবিবার, মার্চ ৩০, ২০২৫

ইমার্জেন্সি যেমন কাটল আমার!

ইমার্জেন্সি যেমন কাটল আমার! - the Bengali Times
বেশ কিছুদিন ধরে আমি কিছু ব্যক্তিগত সমস্যায় ভুগছিলাম মনে করেছিলাম হয়তো ভালো হবে এমনিতেই

বেশ কিছুদিন ধরে আমি কিছু ব্যক্তিগত সমস্যায় ভুগছিলাম। মনে করেছিলাম হয়তো ভালো হবে এমনিতেই। কিন্তু না হওয়ায় আমি সিদ্ধান্ত দিলাম ফ্যামিলি ডাক্তারের সঙ্গে এপয়েন্টমেন্ট বুক করব আজ বৃহস্পতিবার। কিন্তু আবার ভাবলাম আমার যে সমস্যা তা এখনই একটা ট্রিটমেন্ট হওয়া দরকার।

আমি যদি ফ্যামিলি ডাক্তারের কাছে যাই তাহলে কমপক্ষে এক সপ্তাহের কমে তার সঙ্গে এপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যাবে না। তারপর তিনি আমাকে টেস্ট, আল্ট্রাসাউন্ড ইত্যাদি দিলে আরো এক সপ্তাহ তো লাগবেই।

- Advertisement -

তাই আজ যখন কাজ গিয়েছিলাম তখন আমার ম্যানেজারকে বললাম, আমি ইমার্জেন্সিতে যাব। তিনি আমাকে সকাল দশটায় ছুটি দিয়ে দিলেন। আমি ছুটে মাইকল গেরন হসপিটালে ইমার্জেন্সিতে গেলাম। আমি যে কোনো অসুবিধায় ইমার্জেন্সিতে যেতে পছন্দ করি। কারণ, তারা সবকিছু  টেস্ট করে, আল্ট্রাসাউন্ড করতে হলে সেসব করে তারপর ডাক্তার আলোচনা করেন। এতে করে একদিনেই সবকিছু হয়ে যায়।

তো আজ যখন আমি ইমার্জেন্সি পৌঁছালাম তখন বেলা বারোটা হবো হবো। আমি প্রথমে রিসিপশনে একজন ষাটোর্ধ্ব স্মার্ট ফিমেলের কাছে এন্ট্রি করলাম। তারপর ওয়েটিং এরিয়ায় ওয়েট করতে লাগলাম। তার পাঁচ মিনিট পর আমাকে ডাকা হলো আমার কী সমস্যা সেটা ডকুমেন্ট করার জন্য। সঙ্গে আইভি চেক, প্রেসার মাপা ইত্যাদি। এসব করলেন একজন কৃষাঙ্গ মহিলা। সেসব হয়ে গেলে আবার রেজিস্ট্রেশন এরিয়ায় গিয়ে বসলাম। তারপর পাঁচ মিনিট পর আমাকে ডাকা হলো রেজিস্ট্রেশন ডেস্কে। সেখানে একজন পঞ্চাশোর্ধ সাদা স্মার্ট মহিলা আমার এড্রেস ও ফোন নম্বার ডাবল চেক করলেন। তারপর তিনি বললেন, “please follow the green zone and submit the papers on the nurse desk.”

আমি green zone ধরে নার্সদের ট্রেতে আমার ডকুমেন্ট পেপারগুলো রাখলাম। আমাকে তারা ওয়েটিং রুমে বসতে বললেন। আমি গিয়ে বসলাম। সেখানে আরো কয়েকজন বাঙালি এসেছেন। বাংলায় কথা বলছেন তাই বুঝলাম।

বেলা দুইটার সময় আমাকে একজন ছিপছিপে গড়নের বিশ-পঁচিশ বছরের ফর্সা নার্স এসে ডেকে নিয়ে গেলেন আরেকটা চেম্বারে। সেখানে বসিয়ে তিনি পূর্বের ডকুমেন্ট অনুযায়ী ব্লাড নেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। ছয়-সাত টিউব হবে ব্লাড নিলেন টেস্ট করতে হবে বলে। তারপর আমার বাম বাহুতে খালি সুই ফুটিয়ে রাখলেন ইমার্জেন্সিতে যদি আইভি দিতে হয়।

তারপর ঐ নার্স বললেন কমপক্ষে তিন ঘণ্টা লাগবে ডাক্তার দেখতে। ঐসব ব্লাড টেস্ট হবে তখন তিনি দেখবে। আমাকে বসতে বললেন ওয়েটিং রুমে। বাহুতে ইনজেকশন ফুটানোই আছে।  এটা হাসপাতাল থেকে বেরুনোর আগে তারা খুলবে না

আমি নার্সকে বলে হাসপাতালের বাইরে চলে গেলাম। রাস্তায় গাড়ি পার্ক করেছিলাম। টিকিট দিতে পারে। তাই গাড়িটা অন্য কোথায় পার্ক করতে গিয়েছিলাম। আবার হাসপাতালে ফিরে আসলাম বেলা চারটার একটু আগে।

এসে নার্সকে বললাম চলে এসেছি। তিনি বললেন, এখনই তোমাকে ডাক্তার দেখবেন। আমি গিয়ে আবার ওয়েটিং রুমে বসলাম। তার পাঁচ মিনিট পর নার্স এসে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন একটা চেকআপ রুমে। বসতে বললেন ও ড্রেস চেঞ্জ করতে বললেন হসপিটাল গাউনে।

কথা মতো রেডি হয়ে বসে থাকলাম। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল পাঁচটা বাজার তাগিদ। দরজায় আস্তে করে নক করলেন ফিমেল ডাক্তার। আমার চেয়েও একটুখানি লম্বা, ঘাড় পর্যন্ত বাবরি দোলানো সোনালি চুলে ষাটউর্দ্ধ ডাক্তারকে পঞ্চাশের কম দেখাচ্ছে। অমায়িক ব্যবহার। নিজের নাম বলে পরিচয় দিয়ে আমাকে ট্রিটমেন্ট করবেন সেটা জানালেন।

কিছুটা হিসট্রি জানতে চাইলেন। আগে ব্লাড টেস্টে রিপোর্ট ওনার কাছে আছে। বললেন হিমোগ্লোবিনের যথেষ্ট ঘাটতি। তারপর আর কিছু বললেন না রিপোর্ট নিয়ে। বললেন পরে জানাবেন। তারপর তিনি নিজেই একটা টেস্ট করলেন। তারপর বললেন তোমাকে একটা মেডিকেশন দিচ্ছি সমস্যা কম হওয়ার জন্য। মনে করেছিলাম ট্যাবলেট-ট্যাবলেট দেবেন হয়তো।

তারপর বললেন, ওয়েটিং রুমে বসে থাকো। আল্ট্রাসাউন্ড করার জন্য তোমাকে নিয়ে যাবে অন্য সেকশনে। আমি ওয়েটিং রুমে বসে থাকলাম। তখন ঘড়িতে বাজে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা। আমার husband কে ফোন করে বলালাম আবার অবস্থানের কথা।

ওয়েটিং রুম থেকে আরেকজন ইয়াং ফর্সা ছিপছিপে নার্স এসে ডেকে নিয়ে গেলেন নার্সিং এরিয়ায়। একটা চেয়ারে বসতে বললেন। আমি হসপিটালের গাউন পরে আছি। নার্স আমার বাহুতে আগেই পুতে রাখা খালি সুইয়ের মধ্যে এবার আইভি ভরে দিলেন। স্যালাইন টাঙিয়ে রাখলেন। ঐ যে ডাক্তার বলেছিলেন মেডিসিন দেবেন আর আমি মনে করেছিলাম ট্যাবলেট হবে হয়তো সেই মেডিসিন হলো স্যালাইন।

আমাকে ঐ চেয়ারেই অপেক্ষা করতে বললেন। কারণ, আল্ট্রাসাউন্ড সেকশন থেকে কেউ এসে আমাকে নিয়ে যাবেন।

যখন সাড়ে সন্ধ্যা ছয়টা বাজে তখন একজন কৃনাঙ্গ মহিলা এসে অতি বিনয়ের সঙ্গে আমাকে একটা হুইল চেয়ারে বসতে বললেন। তিনিই ঐ চেয়ারটা এনেছেন আল্ট্রাসাউন্ডের সেকশন থেকে। তারপর তিনি অতি দরদে আমার হাত ধরে চেয়ারে বসালেন যদিও আমি নিজেই বসতে পারতাম। তারপর স্যালাইনের লম্বা চাকাওয়ালা মুভিং হোল্ডাডারটা চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে চেয়ার পুশ করে আমাকে নিয়ে গেলেন আল্ট্রাসাউন্ড সেকশনে। সেখানে পাঁচ মিনিট বসে থাকার পর আসলেন একজন ফেন্সি সুন্দর স্মার্ট মহিলা। যার বয়স পঞ্চাশ হবে কিন্তু মনে হচ্ছে ত্রিশ। যাই হোক তিনি আমাকে চেয়ার পুশ করে আল্ট্রাসাউন্ড রুমে নিয়ে গেলেন। অপেক্ষা করতে বললেন।

কিছুক্ষণ পর একজন ফিমেল টেকনিশিয়ান আসলেন। খোলা ঘন সোনালি চুল, নীলাভ চোখের মণি হেসে ওনার নাম জানালেন। বয়স ষাটের বেশি হবে। কিন্তু  স্মার্টনেসের কাছে বয়স বাড়ে নি। বারবার সরি বলতে লাগলেন আমি যদি কোনো অসুবিধা ফিল করি। জিজ্ঞেস করলাম কতো দিন ধরে এখানে কাজ করছেন। বললেন ২৬ বছর।

আল্ট্রাসাউন্ড শেষ হলে এবার আসলেন একজন ইয়াং স্মার্ট ছেলে। তিনি আল্ট্রাসাউন্ড সেকশন থেকে আমাকে আস্তে আস্তে চেয়ার ঠেলে জেনারেল ওয়েটিং এরিয়ায় রেখে গেলেন।

আমার বাহুতে স্যালাইন ঝুলছে। হুইল চেয়ারে বসা। সকাল থেকেই একেবারে তেমন কিছুই পেটে পড়ে নি। কারণ, প্রতি মুহূর্ত ভাবছি বাড়িতে যাব।

রাত সাড়ে নয়টায় একজন ইয়াং নার্স এসে বিনয়ের সঙ্গে জানিয়ে গেলেন সুন ডাক্তার দেখবে।

রাত দশটার দিকে ডাক্তার আসলেন। যিনি আগে দেখেছিলেন তিনিই। কর্মে কতোটা নিবেদিত তা না দেখলে বোঝা যাবে না। প্রতি মুহূর্ত রোগী দেখছেন। যেন কান্তি নেই।

আমি চেয়ারে বসে আছি। ডাক্তার নিজেই আমার হুইল চেয়ার ঠেলে রুমে নিয়ে গেলেন। কতোটা শ্রদ্ধার সঙ্গে তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন অনুভব করার মতো। আমার সামনে বসলেন। সমস্যা আলোচনা করলেন। হিমোগ্লোবিন ও আইরোনের মাত্রা সাংঘাতিক কম। আরো দুটো সমস্যা বললেন। তিনি বললেন, আরো একজন গাইনোকোলজিস্ট আমাকে দেখবেন ও তিনিও একটা টেস্ট করবেন নিজেই।

তারপর তিনি বললেন আজ রাতেই তোমাকে Intravenous (IV) iron দেওয়া হবে যা শেষ হতে দুই ঘণ্টা লাগবে।

তারপর ডাক্তার নিজেই আমাকে ঠেলে বাইরে আনলেন।

সঙ্গে সঙ্গে একজন কৃষাঙ্গ নার্স এসে আমার Intravenous (IV) iron কানেক্ট করে গেলেন। অর্থাৎ এক ব্যাগ রক্তের মতো। সেই নার্স আমাকে আরো হেল্প করলেন। WiFi কনেক্ট করে দিলেন, আমার ফোনে চার্জ দিয়ে এনে দিলেন, একটা স্যান্ডউইচ এনে দিলেন।

তারা বললেন তোমাকে আজকে রাতে থাকতেও হতে পারে। আমি সব আপডেট আমার ম্যানেজারকে জানালাম। তিনি আমাকে কাল ছুটি দিয়ে দিলেন।

আমি হাসপাতালে বসেই লিখছি।রাত সাড়ে এগারোটার সময় একজন গাইনোকোলজিস্ট আসলেন। নানা রকম আলোচনা করলেন। তিনি আবার আরেকজন specialist ডেকে আনলেন। তিনিও বিভিন্ন রকম ইনভেষ্টিগেশন করার কথা জানালেন। কোনো কিছু বাকি থাকতে বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন না। সমস্যা যতদিন ফিল হবে ততদিন নানা রকম চিকিৎসা সেবাও করা হবে। রাত বারোটার পর  Intravenous (IV) iron ডোজ শেষ হলে গাইনোকোলজিস্ট এসে আবার রিভিউ করলেন। তারপর আবার ব্লাড টেস্ট করা হলো হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক আছে কিনা। রাত একটা পর রেজাল্ট নিয়ে আবারো সেই গাইনোকোলজিস্ট এসে জানালেন এখন ঠিক আছে। তিনি specialist রেফার করলেন। আমিই ফোন করব। এক বছরের কম লাস্ট টাইম ভিজিটের সময় হলে নিজেই ফোন করা যায়।

এই যে এতো কিছু করা হলো, কোনো পে করতে হলো না। অন্টারিও ইনস্যুরেন্স OHIPআছে।

যতই ইনস্যুরেন্স থাকুক এখানে আসলে একটা সেবা পাওয়া যায়, চেকআপ করা যায় সেটাই অনেকটা শন্তির কথা।

আল্লাহ আপনাদের সুস্থ রাখুন।

 

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles