
যে কোনো সময় ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা করে বসতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন সময়ের হুমকিতে এমন বার্তাই প্রকাশ পেয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে ভারত মহাসাগরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সেই শঙ্কাকে আরও উসকে দিয়েছে। মনে করা হচ্ছে, ইরানে হামলার আগে নিজেদের যুদ্ধ সক্ষমতা ঝালিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এজন্য ইরানের মিত্র ইয়েমেনের বিদ্রোহীদের ঘাঁটি লক্ষ্য করে একের পর এক হামলাও চালাচ্ছে ওয়াশিংটন।
লন্ডনভিত্তিক ইরানি গণমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, ভারত মহাসাগরের কৌশলগত বিমানঘাঁটি ডিয়েগো গার্সিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সঙ্গে বাগযুদ্ধ আর ইয়েমেনের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মার্কিন অ্যাকশনের মধ্যেই এমন পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটি।
ব্রিটিশ এই অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেখানেই গেল দুই দিনে বি-টু স্টেলথ বম্বার, সি-১৭ কার্গো বিমান ও ১০টি অ্যারিয়াল রিফুয়েলিং ট্যাংকার মোতায়েন করেছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র যে সেখানে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে, তার খবর প্রকাশ্যে এনেছে প্রতিরক্ষা বিষয়ক ওয়েবসাইট ওয়ারজোনও।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়ছে। ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম থামাতে নানা রকম নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অবস্থায় দেশটি আরও আগ্রাসী হয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলিতে বোমা হামলার সিদ্ধান্তও নিতে পারে। আর সেটি যদি হয়, তবে কোন বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র?
এক্ষেত্রে ইরানে হামলা চালানোর জন্য ভারত মহাসাগরে অবস্থিত ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপকে কাজে লাগাতে পারে পেন্টাগন। কেননা, মধ্যপ্রচ্যের খুব কম লোকেরই এই দ্বীপ সম্পর্কে ধারণা আছে। তাছাড়া, দ্বীপটি কয়েক দশক ধরে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
মালদ্বীপ থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে সম্প্রতি বি-২ বোমারু বিমান, স্টিলথ বিমান সংগ্রহ করছে যুক্তরাষ্ট্র। যা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে নির্ভুল হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়।
মার্কিন সামরিক বাহিনী এই সপ্তাহের শুরুতে নিশ্চিত করেছে, তারা দ্বীপে বি-২ বোমারু বিমান মোতায়েন করেছে। এই সপ্তাহের শুরুতে প্ল্যানেট ল্যাবস দ্বারা প্রদত্ত ওপেন-সোর্স স্যাটেলাইট তথ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে তিনটি বি-২ বোমারু বিমান দেখা গেছে। শুক্রবার, অন্যান্য ওপেন-সোর্স অ্যাকাউন্টগুলির প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ঘাঁটিতে কমপক্ষে পাঁচটি বি-২ বোমারু বিমান অবস্থান করছে।
ডিয়েগো গার্সিয়া ভারত মহাসাগরের চাগোস দ্বীপপুঞ্জের অংশ। ১৯৬০-এর দশকে, ব্রিটেন তার উপনিবেশবাদ থেকে সরে আসলেও বিশ্বে একটি শক্তি হিসেবে থাকার জন্য দ্বীপটি নিজেদের দখলে রেখে কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখতে চেয়েছিল। সে আলোকে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সাইপ্রাসে একটি ঘাঁটি তৈরি করেছিল তারা। সেই সঙ্গে প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশ মরিশাসের কাছ থেকে মাত্র ৩ মিলিয়ন পাউন্ডে চাগোস দ্বীপপুঞ্জটি কিনে নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিল। চাগোসের বৃহত্তর দ্বীপ ডিয়েগো গার্সিয়াতে একটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করতে চেয়েছিল তারা। যে কারণে ব্রিটিশরা প্রায় ১,৫০০ স্থানীয় দ্বীপবাসীকে জোরপূর্বক মরিশাস এবং সেশেলসের বস্তিতে বাস্তুচ্যুত করে।
তবে শেষ পর্যন্ত দ্বীপটি নিজেদের দখলে রাখতে পারেনি ব্রিটেন। একটি গোপন চুক্তির অংশ হিসেবে ১৯৬৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৫০ বছরের জন্য দ্বীপটিতে ঘাঁটি স্থাপনের ইজারা নেয় এবং পরবর্তীতে যা আরও ২০ বছরের জন্য সম্প্রসারণ করে তারা। যার বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্যের কাছে আমেরিকান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের খরচ কমিয়ে আনে।
বিস্তৃত মধ্যপ্রাচ্য এবং ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন শক্তি প্রক্ষেপণের জন্য ঘাঁটিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখনই মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে সংকটের মধ্যে পড়ে তখনই এই ঘাঁটিটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।
উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯০ এর দশকের শেষের দিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দাম হোসেনের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যখন বিক্ষিপ্ত বোমা হামলা চালাচ্ছিল। তখন আরও সফল আক্রমণের জন্য সৌদি আররের বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি চেয়েও তা পায়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পরে আমেরিকান সামরিক কৌশলবিদরা সাদ্দামের ইরাকে বোমা হামলা চালানোর জন্য ডিয়েগো গার্সিয়ায় অবস্থিত বি-৫২ বোমারু বিমানের পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন।
এছাড়াও কথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ চলাকালে ইরাক এবং আফগানিস্তানে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার জন্য আমেরিকান বোমারু বিমানগুলি সরাসরি ডিয়েগো গার্সিয়া থেকে উড়েছিল। এই ঘাঁটি থেকেই জ্বালানি নিত বিমানগুলো। সম্প্রতি এই ঘাঁটিতে বোমারু বিমানের সংখ্যা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। স্যাটেলাইট ছবিতে ঘাঁটিতে একাধিক KC-135 জ্বালানি ভরার বিমান দেখা গেছে। যা ইঙ্গিত দিচ্ছে এই ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
ঘাঁটিতে অবস্থিত বি-২ বোমারু বিমান ৩০,০০০ পাউন্ড ওজনের ‘বাংকার-বাস্টার’ বোমা বহন করতে সক্ষম, যা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলিকে গভীর ভূগর্ভে প্রবেশ করতে ব্যবহার করা হতে পারে। ডিয়েগো গার্সিয়ায় তাদের ঘাঁটি স্থাপনের ফলে বোমারু বিমানগুলি হুতি অঞ্চল থেকে ৪,০০০ কিলোমিটার এবং ইরান থেকে ৫,৩০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যা তাদের জ্বালানি ভরার পরিসরের প্রায় ১১,০০০ কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে। যা কাজে লাগাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
সেই ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্পও। শুক্রবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি শক্তি বা দুর্বলতার কারণে এটি বলছি না – আমার চাওয়া আমরা ইরানের সঙ্গে এটি সমাধান করব। কিন্তু যদি আমরা এটি সমাধান না করি, তাহলে ইরানের সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে।’