
বিশাল টরন্টোর যে উপশহরটিতে আমি বাস করি তার নাম মিল্টন। কোলাহলহীন একটি শহর। আর এই শহরটির যে প্রান্তে আমার বাস সেটি খুবই নির্জন শান্তিময় একটি এলাকা। সেখানে ভোরে পাখির ডাক, রাতে ঝিঁঝিঁপোকার টানা শব্দ শোনা গেলেও নেই গাড়ি চলাচলের প্রকট শব্দ, সেখানে শোনা যায় না কোনো বাচ্চার কান্না। বাচ্চা যে নেই তেমন না, এই এলাকাতে এবং তারা যে কাঁদে না, সেটাও না। তারপরও বাচ্চাদের কান্না ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে না।
ভালো আবহাওয়াতে বাইরে এসে বাচ্চারা হৈচৈ করে খেলাধুলা করে। কুকুর আছে বাড়িতে বাড়িতে কিন্তু তারাও যেন সভ্যতার আবরণে ঢাকা। শুধুই স্তব্ধ নির্জনতা। ভরদুপুরে যখন একা থাকি তখন মনে হয় নিশব্দতা ভারী পাথর হয়ে আমার বুকে চেপে আছে। তবুও আমি ভালোবাসি আমার নির্জন এলাকাটিকে। আমার বাসার সামনের বড় গাছটিতে যখন ঝিরিঝিরি বাতাস দোলা খায় তখন আমার হৃদয়ে কেমন যেন একটা হারিয়ে যাওয়া উপলব্ধি কাজ করে।
তবুও আমি আপন মনে গেয়ে উঠি’ ঝিরিঝিরি বাতাস বহে তোমায় মনে পড়ে।’ আমার কাছে এটাই ‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়।’ আসলে নির্জনতাই আমি ভালোবাসি। এর মাঝে যেন শতবার নিজেকে খুঁজে পাই। আর নির্জনতা ভালোবাসি বলেই হয়তো এই শহরটিতে নিজের বাসস্থান বানিয়ে নিয়েছি। আমার বাগানের ঝিরিঝিরি পাতার গাছটি কবে যে এতটা বিশাল আকার ধারণ করলো বুঝতে পারলাম না। প্রতিদিন আমি গাছটির দিকে তাকিয়ে বলি, বাবারে তুই আর কতো পাশে লম্বাতে বাড়বি? এখন যে মাথা উঁচু করেও তোর মাথার শেষ প্রান্ত দেখতে পাই না।
তুই কি গাছ বাবা, আকাশের কাছাকাছি যেতে যাচ্ছিস? গাছটা বড় হওয়াতে পাখিরা ওর ডালে বসে বৃষ্টিতে গা ভিজিয়ে আনন্দ করে। ভেজা গা নিয়ে ওরা একডাল থেকে আরেক ডালে উড়ে যায়। বৃষ্টিতে নিজেদের গা ভিজিয়ে কী সুন্দর করে যে নিজেদের পরিছন্ন করে আমি মুগ্ধ নয়নে চেয়ে দেখি। ডানা ঝাপটা দিয়ে ডানা পরিষ্কার করে। লেজটা উপরের দিকে উঠিয়ে মেলে ধরে পরিষ্কার করার জন্য। ঠোঁট গাছের ডালে ঘঁষে পরিষ্কার করে মুখ, পরিষ্কার করে ডানা দিয়ে মুছে। তাদের মাঝেও পরিছন্ন থাকার কতো কায়দা। খারাপ লাগে তখন যখন দেখি সাঁঝের আলো নিভে এসেছে। ঝাঁকে-ঝাঁকে পাখি দল বেঁধে নীড়ে ফিরছে। কিন্তু কোনো কোনো পাখি নীড়ে ফিরতে পারছে না, কারণ সে খুঁজে পাচ্ছে না তার সাথীকে।
উদ্বিগ্ন হয়ে চোখ এদিক- সেদিক ঘুরিয়ে সঙ্গীকে খুঁজছে আর তার ভাষাতে আকুল হয়ে বিরামহীনভাবে ডেকে চলেছে তার হারিয়ে ফেলা সাথীকে। দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসলো পাখিটির সাথীর ডাক। তখন পাখিটি উত্তেজিত হয়ে আরো জোরে জোরে ডাকতে থাকে এবং আরেকটু উড়ে সামনের দিকে যায়। সাথী পাখি ঠিক মতই তাকে খুঁজে পায়। মুগ্ধ হই দেখে পাখিদের মাঝেও সাথী হারানোর ব্যাকুলতা দেখে। পাখির প্রতি পাখির ভালোবাসা দেখে মনটা ভিজে উঠে। তখন আমিও উদ্বিগ্ন থাকি এই ভেবে পাখিটি খুঁজে পাবে তো তার সাথীকে? দুটি পাখি একসাথে হয়ে ওরা উড়ে চলে যায় তাদের নীড়ে। আমার নির্জন শহরের এমন দৃশ্যগুলো আমাকে খুবই আনন্দ দেয়। আমাদের এক বন্ধু বাংলাদেশ থেকে বেড়াতে এসে আমাকে মজা করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনাদের এখানে বুঝি সারা বছরই হরতাল থাকে?’
যখন মাঝে মাঝে টরন্টো ডাউন টাউনে যাই, সেদিকে তাকালে আমার হৃদপণ্ডিরে ক্রিয়া মোটামুটি বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ শুধু ছুটছে আর ছুটছে, অবিরাম গতিতে ছুটছে। বাস থেকে নেমে ছুটছে, ট্রেন থেকে নেমে ছুটছে। সবার চোখে মুখে, হাঁটার মাঝে কেমন যেন একটা অস্থিরতা। ছুটতে ছুটতেই তাকে তার লক্ষস্থানে পৌঁছাতে হবেই। ট্রেনের নাম ‘গো ট্রেন’, বাসের নাম ‘গো বাস’ আর মানুষগুলোও গোয়ের উপরই থাকে। সব বড় শহরের ডাউন টাউনের অবশ্য একই দৃশ্য। কাজের দিনের মানুষের ছোটার দিকে তাকালে আমার মনে হয় আমার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে যাবে। দেখে মনে হয় কারো মনে যেন কোনো সুখ নেই। কী অদ্ভুত মানুষের জীবন। শুধু ছোটার জন্যই যেন তাদের বেঁচে থাকা।
আমরা এসেছি অন্ধকার থেকে ফিরেও যাবো অজানা অন্ধকারে। মানুষ জীবন তো এই নিরন্তন অন্ধকারের মাঝে এক চিলতে আলো। আবার যাত্রা শুরু হবে এক চিলতে আলো থেকে অন্ধকারে। অথচ ক্ষণিকের আলোর রশ্মিতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মানুষের কত ব্যাকুলতা। এরই নাম হয়তো জীবন। এর নামই বেঁচে থাকা। মানুষের জীবনে কত আশা কত সংগ্রাম। আশা আছে বলেই সেটা পাবার জন্য মানুষের এত সংগ্রাম। কত বৈচিত্র্য, কত মিলন বিরহ, কত সুখ দুঃখ নিয়ে মানুষের জীবন। এসব নিয়ে যখন ভাবতে বসি তখন মনে হয় আমি তো তাদের দলেরই একজন মানুষ। আমার জীবনটাও তো বিচিত্র ঘটনার একটি পাণ্ডুলিপি।
ম্যাল্টন, কানাডা