
প্রজ্ঞা লাবণীর কন্ঠে সানজীদা খাতুনের বই ‘প্রভতবেলার মেঘ ও রৌদ্র’ পাঠ। স্বাধীনতার পর একটা সময় ছিলো চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক জগতে,যেনো জোয়ার এসেছে। শহরের সব হলে বুকিং দেয়া থাকে,খালি পাওয়া মুস্কিল। নাটক,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আবৃতি অনুষ্ঠান,নৃত্য অনুষ্ঠান চলছে তো চলছে। নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাতব্বর বর্তমানে টরন্টোর বাংলা নাট্যব্যক্তিত্ব হাবিবুল্লাহ দুলাল এবং স্বদেশ নামে এক আবৃতি সংগঠনের প্রধান কন্ঠ বন্ধু কাজী আরিফ।
দুলাল মাঝেমধ্যে সুযোগ দিতো কাগজ কেটে মঞ্চ সাজানো দায়িত্বপ্রাপ্ত শিল্পীর সাহায্যকারী হিসেবে আমাকে সুযোগ দিয়ে বলতো – কাঁচিরে তুলির মত চালাইবা! অবাক হতাম একি করে সম্ভব!শুধু কন্ঠে নয় পড়াশোনায় ও কাজী আরিফ খুবই ভালো ছিলো।সহজেই ঢাকায় চলে এলো বুয়েটে। কালেক্রমে পাশ করে স্থপতিও হয়ে গেলো।স্বনামধন্য ভাষা সৈনিক,শিক্ষাবীদ ও শিশু কিশোর সাহিত্যিক ড.হালিমা খাতুনের মেয়ে ভোর সুন্দরী প্রজ্ঞা লাবণীকে বিয়েও করে ফেল্লো।নিজের অফিস খুল্লো।
চট্টগ্রাম থেকে সঙ্গে এনে ছিলো নিজের দরাজ কন্ঠ ও আবৃতি সংগঠন করার তীব্র ইচ্ছা। দাঁড়া করিয়ে ফেল্লো ‘মুক্তকন্ঠ’ তখন বাংলা কবিতা আবৃতি করতেন অনেকে বেশির ভাগ নামী অভিনেতা কন্ঠ ভালো বলেই আবৃতিও করেন যেমন গোলাম মুস্তফা,হাসান ইমাম আরো কয়েকজন এদের পরিচয় আবৃতিকার নয় এরা চানও নাই আবৃতি তার যোগ্য সন্মান,যোগ্য প্রাপ্য পাক। আবৃতিকে তরুণ থেকে অতি তরুণ এমন কি বালক বালিকার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার কাজটি কাজী আরিফ ও প্রজ্ঞা লাবণীর দ্বারাই হয়েছে মুক্তকন্ঠে মাধ্যমে।
বাংলাদেশে কন্ঠ আবৃতিকে এক সন্মানের জায়গায় প্রথম তুলে এনে ছিলেন তারা দুইজন। আমাকে পর্যন্ত কেউ-কেউ অভিভাবক জিজ্ঞেস করতেন তাদের ছোট সন্তানদের আবৃতি শুদ্ধ উচ্চারণ শিখাতে মুক্তকন্ঠে ভর্তি করতে চাই। আজ বিশ্বজুড়ে যেখানেই বাঙালি আছে সংগঠনের মধ্যে আবৃতি সংগঠনই বেশি।শহর টরন্টোতেও নয় মাসে না হোক বছর দুইতিন বছরে এক একটি নতুন আবৃতি সংগঠন জন্মাচ্ছে।যখনি শনি বন্ধু আরিফ আর লাবণীর কথা মনে পড়ে।
তাদের এককালে আবৃতির জন্যে অক্লান্ত পরিশ্রম সার্থক মনে হয়। শুদ্ধ হোক আর অশুদ্ধ হোক আবৃতি জনপ্রিয় হচ্ছে,আজ না হয় কাল শুদ্ধতাও আসবে। আজকের প্রতি পহেলা বৈশাখের আগের রাত চিনমৈত্রীতে জমজমাট চৈত্র সংক্রান্তি আয়োজন হয় এটিও কাজী আরিফ আর প্রজ্ঞা লাবণী প্রথম শুরু করে ছিলো তাদের ইন্দিরা রোড বাড়িতে। মঞ্চ টিভির যত নামী অভিনেতা অভিনেতী,শিল্পী, সাহিত্যিক আসতেন।সাধারণত স্বার্থ ছাড়া রাজনৈতিক নেতারা কোথাও যাননা।
তবে এই চৈত্রে শেষরাত উৎসবে ঠিকই আসতেন। একবার গিয়ে দেখি তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাও এসেছে। থাক এখন সেই সব পুরোনো দিনের কথা। বর্তমানে আসি। সদ্য প্রয়াত স্বনামধন্য সানজীদা খাতুনের আত্মজীবনী বই ‘ প্রভাতবেলার মেঘ ও রোদ্র’ ইউ টিউবের জন্যে পাঠ করেছেন প্রজ্ঞা লাবণী। ২০ পর্বের একটি তিন মিনিটের অংশ শুনতে পাঠিয়েছেন। আজকাল চল হয়েছে জনপ্রিয় লেখকদের বই ইউ টিউবে পাঠ করা।
কিছু ভালো হলেও বেশির ভাগ শুনতে গেলে চুল খাড়া হয়ে ওঠে,যেমন পাঠ ভঙ্গি তেমনি কন্ঠ অনেকেরতো আঞ্চলিক টানই পরিস্কার হয়নি। এর মাঝে ল্যাপটপে কানে হেডফোন দিয়ে প্রজ্ঞা লাবণীর কন্ঠে ‘ প্রভাতবেলার মেঘ ও রৌদ্র’ যত শুনছি মনে হচ্ছে আমি সকাল বেলায় ছোট ডিঙ্গিতে ভেসে পড়েছি অন্টারিওর কোনো পাহাড় সবুজ সব প্রাচীন বিশাল বৃক্ষে ভরা অচিন লেকে। কি চমৎকার স্বাভাবিক গলায় পাঠ করে গেছে সানজীদা খাতুনের যৌবনকালের স্মৃতি টুকরো-টুকরো মেঘের মত। অপূর্ব,ভালো লাগলো। শেষ হতে আর ইচ্ছে হলোনা কিছু লিখতে বা আঁকতে এমন কি নেটফ্লিক্সে ডুব দিতেও চাই ছিলোনা মন।
সামনে ল্যাপটপে সাড়ে তিন মিনিটের পাঠ শুনলাম কিন্তু দেখলাম এক স্থিরচিত্র গতানুগতিক এক সূ্র্য ডোবা ছবির ওপর আমারই করা ‘প্রভাতবেলার মেঘ ও রোদ্র’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ইচ্ছে করলো এর মাঝে সানজীদা আপার ছবি খুঁজে যদি পেস্ট করি কেমন লাগবে। অন্তত স্থির একটি ছবির চেয়ে হয়তো ভালো লাগতে পারে। আবার দেখলাম ব্যাকগ্রাউন্ডে হাল্কা পিয়ানো জুড়ে দিলাম। বাহ নিজেই দেখে খুশি। আমি খুশি হলেতো আর হবেনা! প্রজ্ঞার অনুমতি ছাড়াই করেছি। প্রজ্ঞা লিখতেই উত্তর এলো- কি সৌভাগ্য! অধীর আগ্রহে দেখতে বসে আছি তাড়াতাড়ি পোস্ট করেন।
স্কারবোরো, কানাডা