
বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বন্ধন, যা পারস্পরিক বোঝাপড়া, ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে। কিন্তু যখন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত কেউ বিয়েতে আবদ্ধ হন, তখন সেটি কি তার জন্য সমাধান হয়ে ওঠে, নাকি নতুন জটিলতার জন্ম দেয়?
অনেকেই মনে করেন, বিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বা অসুস্থ মানুষের জন্য একটি শক্তিশালী সাপোর্ট সিস্টেম হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বৈবাহিক জীবন মানসিক রোগীদের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে যদি সঙ্গী তার সমস্যাগুলো বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে সক্ষম হন। তবে, সমস্যাটি তখনই দেখা দেয়, যখন মানসিক স্বাস্থ্যগত জটিলতার বিষয়টি গোপন রেখে কাউকে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন মানুষের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে সঙ্গীর জানার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। মানসিক অবসাদ, ওসিডি, চরম দুশ্চিন্তা বা তীব্র মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি তার অসুস্থতার কথা জানার সুযোগ না পায়, তবে বিয়ের পর মানসিক চাপ, পারিবারিক কলহ এমনকি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু মানসিক সমস্যা তুলনামূলক মৃদু পর্যায়ের হলেও, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডার বা ম্যানিয়ার মতো জটিল রোগগুলোতে আক্রান্তদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এসব ক্ষেত্রে সঠিক চিকিৎসা না হলে রোগীর আচরণ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে পারে, যা পারিবারিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সহিংসতার ঘটনাও ঘটতে পারে।
অন্যদিকে, বিয়ের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ডিভোর্স বা একাকীত্বের শিকার ব্যক্তিদের বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং মানসিক রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। সঙ্গীর সহানুভূতি, যত্ন এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা অনেক রোগীর জন্য নিরাময়ের পথে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটি তখনই সম্ভব, যখন বিয়ে একটি পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে গঠিত হয় এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো সম্পর্কে উভয়পক্ষই সচেতন থাকে।
তাই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, মানসিকভাবে অসুস্থ কোনো ব্যক্তিকে বিয়ে দেওয়ার আগে অবশ্যই একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ, বিয়ে নিজেও একটি মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যদি মানসিকভাবে অস্থির কেউ এই চাপ নিতে অক্ষম হন, তবে তার জন্য বিয়ে সমাধানের পরিবর্তে নতুন জটিলতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
অতএব, বিয়ে একটি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এটি মানসিক সুস্থতার পক্ষে ইতিবাচক হতে পারে, যদি তা সঠিক বোঝাপড়া ও স্বচ্ছতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। কিন্তু যদি মানসিক সমস্যার বিষয়টি লুকিয়ে রাখা হয়, তবে তা শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো পরিবারকেই সংকটে ফেলে দিতে পারে।